রোহিঙ্গা সংকট ৩৫ হাজারের ঘরে ৬ লাখ অতিথি

শিরোনামটিতে তেমন খটকা লাগার কথা নয়। সমস্যাটা সবারই জানা। ৫ লাখ জনসংখ্যার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় এখন ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করছে। শূন্যরেখায় বসবাসকারীদেরও এপারে পাঠিয়ে তাদের সংখ্যা বাড়াতে মিয়ানমার সক্রিয় রয়েছে। প্রকৃতির নিয়মে গড়ে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে ৬০ জন শিশু। এই ১১ লাখের হিসাবটা মোটাদাগের। উপজেলা দুটির সর্বত্র একই হারে থাকছে না তারা। থাকা সম্ভবও নয়। যেখানে সম্ভব হয়েছে, সেখানেই ‘অস্থায়ী’ বসতি গড়ে দিয়েছে সরকার। সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা। এই রোহিঙ্গাদের ৬ লাখেরই নিবাস উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নে। এর পরের স্থানেই রয়েছে রাজাপালং।

প্রথমেই দেখে নিই তারা কেমন আছে। কথাশিল্পী জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী ১৯৫৫ সালে বারো ঘর এক উঠোন শিরোনামে একটি উপন্যাস লিখেছেন। সেই উপন্যাসের পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর ও দেশভাগ-পরবর্তী সময়ের। গভীর মন্দা ও অব্যবস্থায় গোটা দেশ ভাসছে। এমনি সময়ে কলকাতার বেলেঘাটার একটি বস্তিজীবনকে কেন্দ্র করে এ উপন্যাস। বারবার গভীর পর্যবেক্ষণে রোহিঙ্গা শিবিরগুলো দেখে মনে হয় কলকাতার সে বস্তিটিও তাদের কাছে আজ তারকা হোটেলবিশেষ। অথচ সবই তাদের ছিল। বাড়িঘর, জমিজমা, পুকুর, ফলের গাছ ও মাছের ঘের। আজ নিষ্ঠুর জাতিগত নিধনের শিকার হয়ে আমাদের করুণাপ্রার্থী। আমাদের সরকার ও জনগণ সূচনা থেকে উদারভাবে গ্রহণ করেছে তাদের। কয়েকটি মোড়ল রাষ্ট্রের মদদে এমনটি করতে পারছে মিয়ানমার। তবে মোটামুটি গোটা বিশ্বের সহানুভূতি আর সমর্থন রোহিঙ্গাদের দিকেই। এ কার্যক্রমে বাংলাদেশ অগ্রণী হওয়ায় প্রশংসিতও হচ্ছে আন্তর্জাতিক মহলে। বৈষয়িক সহায়তা আশানুরূপ না হলেও মিলছে।

ছোট উপজেলা উখিয়ার আয়তন ২৬১ কিলোমিটার। এর পাঁচটি ইউনিয়নের একটি পালংখালী। জনসংখ্যা ৩৫ হাজার। তাদের জীবনযাত্রা থমকে গেছে রোহিঙ্গাদের আগমনে। অনেকেরই নিজস্ব জমি গেছে রোহিঙ্গা বসতি বা রাস্তায়। বন বিভাগের বা খাসজমির কিছু অব্যবহৃত প্রান্তিক অংশ বা ঝিরি ইজারা নিয়ে তারা ধান কিংবা মৌসুমি সবজির আবাদ করত। ছিল কিছু মাছের চাষ। এগুলো সব গেছে। সুযোগ নষ্ট হয়েছে গবাদিপশু উন্মুক্তভাবে পালনের। অনিয়ন্ত্রিত শিবিরবাসী স্থানীয় শ্রমবাজারেও উপস্থিত। শোচনীয়ভাবে কমে গেছে মজুরি।

অন্যদিকে ভোগ্যপণ্যের ওপর এত অধিক লোকের চাহিদায় মূল্য গগনচুম্বী। রোহিঙ্গারা সরকারের মাধ্যমে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থার ত্রাণসহায়তা পাচ্ছে। বিভিন্ন সংস্থার চিকিৎসা–সহায়তা শুরুর দিকে মহামারির মতো অবস্থা সামাল দিয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের চাপে স্থানীয়দের কম গভীর নলকূপগুলো অচল হয়ে গেছে। অন্যদিকে বর্জ্য নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা শোচনীয়ভাবে অপ্রতুল। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার আশু সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হবে—সম্ভবত সে বিবেচনায় সরকার নিজস্ব অর্থে ভাসানচরে ১ লাখ রোহিঙ্গার বসবাসের ব্যবস্থা করেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, সেখানে ত্রাণকাজ পরিচালনাসহ সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা হালের চেয়ে অনেক ব্যয়বহুল হওয়ার কথা। বিষয়টি কিছুটা বিতর্কও সামনে এনেছে। আর কমল ১ লাখ। এতে গোটা পরিবেশের কীই-বা যাবে-আসবে!

৩৫ হাজার লোকের মধ্যে ৬ লাখ লোককে দীর্ঘকাল রাখার ব্যবস্থা যে সম্ভব নয়, এটা ভাবার সময় এসেছে। সময় এসেছে ১১ লাখ লোককেই অন্যত্র স্থানান্তরের। অবশ্যই তাদের স্বাভাবিক গন্তব্যস্থল নিজ ভূমি মিয়ানমার। কিন্তু সেখানকার সরকারের মনোভাবের পরিবর্তন আনতে বিশ্বসমাজ এখনো তেমন সফল হয়নি। তাই বলা চলে নাটকীয় কিছু না ঘটলে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হবে। তাই আমাদের বিভিন্ন বিকল্প ভাবতে হবে। বিকল্প হিসেবে ১ লাখকে ভাসানচরে স্থানান্তর যথেষ্ট নয়। ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর বেশ কয়েকটি শ্রমশক্তি আমদানিকারক ধনী দেশ। সেসব দেশে বেশ কিছু লোককে স্থানান্তরের প্রচেষ্টা নেওয়া যেতে পারে। বিশাল দেশ কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া, এমনকি ইউরোপ অবলীলায় স্থান দিতে পারে তাদের। ভুটান থেকে ফিরে যাওয়া ১ লাখ নেপালি উদ্বাস্তুর সবাইকে তারা স্থান দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রেও এমনটি হতে পারে। জার্মানি ১০ লাখ সিরীয় শরণার্থী নিয়েছে।

রোহিঙ্গারা যেখানেই যাক, কাজ করেই খাবে। শুধু সেখানকার অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো একটু সহায়তা দরকার। এটা অসম্ভব কাজ নয়। এ সমস্যায় ভারতের ভূমিকা আমাদের হতাশ করেছে। ভারত মহাসাগরে নেতৃত্বের অভিলাষী চীনের কাছেও আমরা অপ্রয়োজনীয় নই। রাশিয়ার সঙ্গেও আমাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তারাই গড়ছে। কিন্তু এ দুটি দেশের ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে বিপন্ন করার জন্য মিয়ানমারের উগ্র জাতীয়তাবাদী সরকারের হাতকে মদদ দিয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষও।

পালংখালীর ৩৫ হাজার মানুষ ৬ লাখ রোহিঙ্গা নিয়ে বসবাস করতে গিয়ে যে ভোগান্তির সম্মুখীন, তা পুষিয়ে নিতে নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। এ দুটি উপজেলার স্থানীয় অধিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করে জাতিসংঘে জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যান তৈরি হয়েছে ৯৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের। এ অর্থের ২৫ শতাংশই স্থানীয়দের জন্য ব্যয় হওয়ার কথা। অথচ সদস্য ধনী দেশগুলো সে পরিকল্পনার চাহিদার অনেক কম সহায়তা দিচ্ছে। এতে রোহিঙ্গাদের খাদ্য ও চিকিৎসার প্রয়োজন মেটানো যাবে কি না, এ নিয়ে সংশয়ে আছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

এ অঞ্চলে আগত রোহিঙ্গাদের অন্যান্য সহায়তা দেওয়া হলেও জ্বালানির জন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। জাতিসংঘের ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের (আইএসজি) এক প্রতিবেদন বলছে, রোহিঙ্গারা স্থানীয় বনবাদাড় থেকে প্রতিদিন গড়ে ৭০০ টন জ্বালানি সংগ্রহ করছে। এভাবে চললে ২০১৯ পর্যন্ত কক্সবাজারের বনভূমি শেষ হয়ে যাবে। ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে অমূল্য বন্য প্রাণী। সিলিন্ডার গ্যাস ও চুলা সরবরাহ করলে এর একটি বিহিত হয়। রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বেশ কিছু স্থানীয় মানুষকে চুলা ও সিলিন্ডার দেওয়া হবে বলে গত নভেম্বর থেকে বলা হচ্ছে। ২ লাখ চুলার ব্যবস্থা হয়ে গেছে—এমনটা প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি। খেসারত দিচ্ছে এবং বহুকাল দেবে উখিয়া ও টেকনাফের পরিবেশ ও প্রকৃতি। আইএসজির জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক টেকনিক্যাল গ্রুপের মতে, ব্যাপকসংখ্যক রোহিঙ্গা এ অঞ্চলে আসায় জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে ধরলে পালংখালীতে হয়েছে ২০ গুণের মতো। সে প্রতিবেদন অনুসারে দেখা দিয়েছে পরিবেশ বিপর্যয়। বিরাটসংখ্যক মানুষের মলমূত্র যথাযথ নিষ্কাশন না হওয়ায় ছড়িয়ে পড়ছে ই-কোলি ব্যাকটেরিয়া। মলমূত্রে দূষিত হয়ে পড়েছে রোহিঙ্গা শিবিরের আশপাশের কৃষিজমিও।

এ সমস্যার চূড়ান্ত সমাধান মিয়ানমারের হাতে, এটা সবারই জানা। হাজারো সমস্যার মধ্যে স্থানীয়রা ধৈর্য ধরে রোহিঙ্গাদের সহানুভূতি দেখাচ্ছে, সহযোগিতা করছে। তবে তাদের বেঁচে থাকার পথে প্রতিবন্ধকতা দূর করার জন্যও নানামুখী পদক্ষেপ দরকার। জাতিসংঘের জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানে নিম্ন আয়ের স্থানীয় অধিবাসীদের জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ পাওয়া নিশ্চিত করা দরকার। গোটা অঞ্চলটির বিধ্বস্ত সড়ক অবকাঠামো নতুন করে গড়ে তোলার জন্য উদ্যোগও এখন সময়ের দাবি। ধ্বংসপ্রাপ্ত বনভূমি পুনরায় গড়ে তুলতেও আশু কার্যক্রম নিতে হবে। তবে এত সংখ্যক রোহিঙ্গা এ অঞ্চলে রেখে এর কোনোটাই হবে না। তাদের প্রত্যাবাসন যখনই হোক ভিন্ন কোনো দেশে বিরাটসংখ্যককে পাঠানোর কূটনৈতিক জোর উদ্যোগ প্রয়োজন।

জনবহুল বাংলাদেশে এদের আবাসন ও কর্মসংস্থান অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং একরকম অসম্ভব। তা ছাড়া, এখানকার স্থানীয় অধিবাসীদের দিকও দেখতে হবে। নিজ দেশে ওরা আজ পরবাসী হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের দাবির পাশাপাশি স্থায়ী-অস্থায়ীভাবে তৃতীয় দেশে পুনর্বাসনের রাস্তা খুললেও কিছু সুফল মিলবে।

আলী ইমাম মজুমদার সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব

Related posts

Leave a Comment